58, Kha para, Tongi, Gazipur, Dhaka
Visit Store
লেখক : ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভী
পৃষ্ঠা : ২২২
বিষয় : জীবনী
পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহান ও মর্যাদাবান নারীর জন্ম হয়েছে, তাঁদের কাতারে হযরত খাদিজা (রা.) এক অনন্য নাম। তিনি একদিকে ইসলামের প্রথম নারী অনুসারী, অন্যদিকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম মানব—প্রিয় নবিজি (সা.)-এর জীবনের অবিচ্ছেদ্য আশ্রয়, ভালোবাসা ও প্রশান্তির ঠিকানা। নবিজির হৃদয়ের গভীর কেন্দ্রে যাঁর অবস্থান, সেই মহীয়সীকে নিয়ে আজও আমাদের জানার অপূর্ণতা রয়ে গেছে অনেক। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই ইয়াহইয়া ইউসুফ নদভির রচনার অনুবাদে, মনোমুগ্ধকর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা (রা.)।
কৈশোরে খাদিজা (রা.) ছিলেন আপন পরিবারে আদর-স্নেহে ঘেরা এক অনন্য রত্ন। অল্প বয়সেই তাঁর জীবনে আসে প্রথম বিবাহ। স্বামী আতিক বিন আবিদের ঘরে পা রেখে এক অপরিচিত পরিবেশে নিজ গুণে আপন করে নেন সবাইকে। দাম্পত্য জীবনে তারা হয়ে ওঠেন মক্কার অনুকরণীয় এক দম্পতি। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁদের ঘরে আসে এক কন্যাসন্তান। কিন্তু এই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। আতিকের ইন্তেকালে খাদিজার জীবনে নেমে আসে গভীর শোক। স্বামীর স্মৃতি আর সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েই বাকি জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পিতা খুয়াইলিদের অনুরোধে পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিবাহে সম্মত হন খাদিজা (রা.)। নাব্বাশ ইবনে জুররাহ আত-তামিমির সঙ্গে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। এই সংসারেও তিনি ছিলেন সমানভাবে প্রশংসিত ও প্রিয়। পরপর দুই বছরে জন্ম নেয় দুই পুত্রসন্তান। সুখে ভরা এই সংসার নিয়েই তাঁর মনে জন্ম নেয় অজানা শঙ্কা—এই সুখ কি টিকে থাকবে? আশঙ্কাই একদিন বাস্তবে রূপ নেয়। নাব্বাশের ইন্তেকালে খাদিজা আবারও একাকিত্বের মুখোমুখি হন।
পরপর দুটি শোক তাঁকে ভেঙে দিলেও তিনি হার মানেননি। সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে দায়িত্ব নেন স্বামীর ব্যবসার। অসাধারণ প্রজ্ঞা ও দক্ষতায় অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন মক্কার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী। তখনই তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন—আর কোনো বিবাহ নয়, সন্তানদের নিয়েই জীবন কাটাবেন। কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন।
এক রাতে তিনি দেখেন এক বিস্ময়কর স্বপ্ন—এক দীপ্তিমান, পবিত্র পুরুষ যেন তাঁকে আহ্বান করছেন। সেই স্বপ্নই ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। তিনি ছিলেন আল-আমিন মুহাম্মদ (সা.), যিনি পরবর্তীতে হবেন তাঁর জীবনসঙ্গী এবং বিশ্বজাহানের নবী।
ব্যবসায়িক সফরে মুহাম্মদ (সা.) যখন খাদিজার কাফেলার নেতৃত্ব দেন এবং সিরিয়া গমন করেন, তখন তাঁর সততা, বুদ্ধিমত্তা ও চরিত্রে খাদিজা (রা.) মুগ্ধ হন। তিনি নিশ্চিত হন—স্বপ্নের সেই মানুষ তিনিই। প্রিয় বান্ধবী নাফিসার মাধ্যমে পাঠান বিবাহের প্রস্তাব। অতঃপর আসে সেই ঐতিহাসিক মিলনের ক্ষণ।
এই দাম্পত্য জীবনের মধ্য দিয়েই পৃথিবী পায় ভালোবাসা, দায়িত্ব ও বিশ্বাসে গড়া এক অনন্ত আদর্শ। নবুওত-পূর্ব ও পরবর্তী জীবনে তাঁদের সংসার হয়ে ওঠে মুমিন-মুমিনাদের জন্য চিরন্তন অনুপ্রেরণা।
এই গ্রন্থটি সিরাতের আলোকে গল্পের আবরণে খাদিজা (রা.)-এর পুরো জীবনকে তুলে ধরেছে—কৈশোর থেকে শুরু করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। অনুবাদকের ভাষায়, খাদিজা (রা.)-এর সংগ্রাম ও নবুওত-স্নাত জীবনের সামান্য পরশ যদি কোনো নারীর জীবনে লাগে, তবে সেও ইতিহাসে মহীয়সী হয়ে উঠতে পারে।
নবুওত-পূর্ব পনেরো বছরের দাম্পত্য জীবন—ভালোবাসা, অভিমান, দায়িত্ব আর সংসারের রঙিন মুহূর্তে ভরপুর—এই কাহিনি পাঠককে আবেগে আচ্ছন্ন করে রাখে। শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছে মনে হয়, এ গল্প যেন এখানেই শেষ না হয়।
ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠ নারীর জীবনকথা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও হোক অনুপ্রেরণার উৎস। গল্পে আঁকা মহীয়সী খাদিজা (রা.) শুধু একটি বই নয়—এটি প্রতিটি ঘরের শোভা ও নিত্যপাঠের যোগ্য এক অনন্য সম্পদ।